ভূমিকম্পের সতর্কতা: দুর্যোগকালে করণীয়, বর্জনীয় কাজ এবং জরুরি ইসলামিক দু'আ
প্রকৃতির সংকেত ও জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব
ভূমিকম্প হলো প্রকৃতির এমন এক আকস্মিক ঘটনা, যা এক মুহূর্তেই আমাদের জীবনের সমস্ত কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়। এই নীরব কম্পন আমাদের জীবনের চরম অনিশ্চয়তা এবং মানবসৃষ্ট কাঠামোর ভঙ্গুরতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। এই সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকা এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যেমন জীবন রক্ষার জন্য অপরিহার্য, তেমনি একজন মুসলিম হিসেবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং দু'আ পাঠ করাও ঈমানের অপরিহার্য অংশ।
এই পোস্টে আমরা জানব ভূমিকম্প চলাকালীন এবং এর পরে আমাদের কী কী জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে (করণীয় ও বর্জনীয়), এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—আল্লাহর কাছে সাহায্য ও নিরাপত্তার জন্য কোন কোন দু'আ ও আমল করা উচিত।
১. ভূমিকম্প চলাকালীন জীবন রক্ষায় করণীয় কাজ
ভূমিকম্প শুরু হওয়ার সময় সাধারণত কয়েক সেকেন্ড থেকে এক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এই অল্প সময়ের মধ্যে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা জীবন রক্ষার প্রথম ধাপ।
ক. কম্পন শুরু হলে: 'Drop, Cover, and Hold On'
- আশ্রয় নিন (Drop): দ্রুত মেঝেতে বসে পড়ুন বা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ুন। এটি আপনাকে কম্পনের কারণে পড়ে যাওয়া থেকে বাঁচাবে।
- আবৃত করুন (Cover): মাথা ও ঘাড় হাত দিয়ে আবৃত করুন এবং দ্রুত কোনো মজবুত আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নিন (যেমন: শক্ত টেবিল, ডেস্ক)।
- ধরে থাকুন (Hold On): কম্পন না থামা পর্যন্ত আশ্রয় নেওয়া বস্তুটিকে শক্ত করে ধরে থাকুন, যাতে এটি সরে না যায়।
খ. আপনি কোথায় আছেন তার ভিত্তিতে করণীয়:
বাসা বা অফিসের ভেতরে:
- দ্রুত বিছানা, টেবিল বা ডেস্কের নিচে আশ্রয় নিন।
- জানালা, কাঁচের দরজা, আলমারি, বা ভারী আসবাবপত্র থেকে দূরে থাকুন।
- যদি কোনো আসবাবপত্রের নিচে আশ্রয় নিতে না পারেন, তবে ঘরের ভেতরের দিকের (ইন্টারনাল) কোনো দেয়ালের পাশে বসে মাথা ও ঘাড় দু'হাত দিয়ে ঢেকে নিন।
বাইরে বা খোলা স্থানে:
- দ্রুত ভবন, গাছ, বিদ্যুতের খুঁটি, ল্যাম্পপোস্ট এবং ফ্লাইওভারের নিচ থেকে দূরে খোলা জায়গায় চলে যান।
- খোলা স্থানে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ুন এবং কম্পন না থামা পর্যন্ত সেখানে থাকুন।
গাড়িতে থাকলে:
- তাৎক্ষণিকভাবে ট্র্যাফিকের বাইরে একটি খোলা জায়গায় গাড়ি থামান।
- ব্রিজ, ফ্লাইওভার বা সুড়ঙ্গের ভেতরে গাড়ি থামাবেন না।
- কম্পন না থামা পর্যন্ত গাড়ির ভেতরেই থাকুন।
২. ❌ ভূমিকম্পের সময় যে কাজগুলো বর্জনীয়
জীবনের ঝুঁকি বাড়ায় এমন কাজগুলো অবশ্যই এড়িয়ে চলতে হবে:
- আতঙ্কিত হওয়া ও চিৎকার করা: আতঙ্কিত হলে মস্তিষ্ক দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। শান্ত থাকার চেষ্টা করুন।
- দৌড়ে পালানো: কম্পন চলাকালীন দৌড়ালে পড়ে গিয়ে বা আঘাত পেয়ে আহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- সিঁড়ি ব্যবহার করা: সিঁড়ি হলো ভবনের দুর্বল অংশগুলোর একটি। দ্রুত নামার চেষ্টায় পদদলিত হওয়ার বা সিঁড়ি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- লিফট ব্যবহার করা: বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে লিফটে আটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে।
- ফোন ব্যবহার: জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ফোন ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি জরুরি পরিষেবাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করতে পারে।
আরও পড়ুনঃ ভূমিকম্পের (earthquake) সতর্কতা ও করণীয় কি?
৩. ভূমিকম্প চলাকালীন ও পরে পাঠের দু'আ ও আমল
ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আল্লাহর নিদর্শন এবং সতর্কবার্তা। এই সময়ে মুমিনের প্রধান কাজ হলো আল্লাহর দিকে ফিরে আসা।
ক. দু'আ ও যিকির (স্মরণ):
ভূমিকম্পের মতো বিপর্যয় দেখলে রাসূলুল্লাহ (সা.) এই দু'আ ও আমলগুলো করার নির্দেশ দিয়েছেন:
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া (ইস্তিগফার):
"আস্তাগফিরুল্লাহ"
অর্থ: আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। বিশ্লেষণ: এই সময়ে দ্রুত বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন, কারণ আমাদের পাপের কারণেই এমন বিপদ আসতে পারে।
কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ:
"আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ।"
বিশ্লেষণ: জীবন-মৃত্যুর চরম অনিশ্চয়তায় আল্লাহর একত্ব এবং রাসূলের (সা.) রিসালাতের সাক্ষ্য দিয়ে ঈমানকে দৃঢ় করুন।
আশঙ্কা ও ভয়ের দু'আ:
"আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা খায়রাহা ওয়া খায়রা মা ফীহা ওয়া খায়রা মা উরসিলুহূ বিহি, ওয়া আউযুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি মা ফীহা ওয়া শাররি মা উরসিলুহূ বিহি।"
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে এর (ভূমিকম্পের) কল্যাণ চাই এবং এর মধ্যে যা কল্যাণ আছে, তাও চাই। আর তুমি যা কিছু দিয়ে এটিকে প্রেরণ করেছ, তারও কল্যাণ চাই। আর আমি তোমার কাছে এর ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই এবং এর মধ্যে যা ক্ষতি আছে, তা থেকে এবং যা কিছু দিয়ে এটিকে প্রেরণ করেছ, তারও ক্ষতি থেকে আশ্রয় চাই। (সহীহ মুসলিম)
আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা:
"লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।" অর্থ: আল্লাহ ছাড়া কোনো ক্ষমতা বা শক্তি নেই। বিশ্লেষণ: এটি চরম helplessness বা দুর্বলতার সময় আল্লাহর সার্বভৌমত্বের স্বীকৃতি।
খ. আমল:
নামাজে মনোযোগী হওয়া: বিপদ থেকে মুক্তি ও নিরাপত্তার জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করে দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করা যেতে পারে।
ধৈর্য (সবর) ধারণ: বিপদকে আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষা মনে করে ধৈর্য ধারণ করা।
৪. ভূমিকম্পের বার্তা: আল্লাহর পথে জরুরি প্রত্যাবর্তন
ভূমিকম্পের সবচেয়ে কঠিন এবং গভীর বার্তা হলো, এটি আমাদের জীবনের 'কাল' বা 'পরে' করার সমস্ত পরিকল্পনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এই বিপর্যয় যেন আল্লাহর পক্ষ থেকে শেষ সতর্কবার্তা।
- নামাজ: অবহেলার চরম মূল্য: আপনি হয়তো ভাবছেন, "আজ নয়, কাল থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ধরব।" আপনি জানেন যে নামাজ পড়া ফরজ, কিন্তু পড়ছেন না। যদি আজ এই কম্পন আপনার জীবনের শেষ হতো, তবে আল্লাহর কাছে আপনার সেই না-পড়া নামাজের জন্য কী জবাব থাকত? রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "কিয়ামতের দিন বান্দার হিসাবের জন্য প্রথম প্রশ্ন হবে নামাজ সম্পর্কে।" আপনি সেই প্রথম প্রশ্নের জন্য কী প্রস্তুতি নিলেন? আপনার সেই 'কালকের' জন্য ফেলে রাখা নামাজটি কি আজকের ভূমিকম্পের পর পড়ার সুযোগ পাবেন? এই কম্পন আপনাকে সুযোগ দিচ্ছে আজ, এখনই আল্লাহর দিকে ফিরে আসার।
- তাওবা: ক্ষমা চাওয়ার শেষ সুযোগ: আপনি হয়তো মনে মনে ভাবছেন, "জীবনে অনেক পাপ হয়েছে, একসময় মন থেকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইব এবং তাঁর পথে ভালোভাবে চলব।" কিন্তু যদি এই ভূমিকম্পেই আপনার মৃত্যু হতো, তবে কি আপনি আপনার পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়ার সেই সুযোগটুকুও পেতেন? জীবন আর মৃত্যুর মাঝের দূরত্ব এই মুহূর্তে এক সেকেন্ডেরও কম। আপনি যখন ক্ষমা চাওয়ার জন্য 'সঠিক সময়ের' অপেক্ষা করছেন, জীবন হয়তো তার শেষ মুহূর্ত গুনছে।
আল্লাহ আপনাকে সুযোগ দিচ্ছেন। তিনি আপনার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন যেন আপনি তাঁর কাছে ফিরে আসেন। এই কম্পনকে সেই "শেষ সংকেত" হিসেবে গ্রহণ করুন। আপনার সেই 'পরে' করা ভালো কাজগুলো এখনই শুরু করুন। নামাজে ফিরে আসুন, আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান এবং তাঁর পথে জীবন পরিচালনার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করুন।
আরও পড়ুনঃ ভূমিকম্পে করণীয়, বর্জনীয়: জরুরি সুরক্ষা টিপস এবং আল্লাহর দিকে দ্রুত প্রত্যাবর্তন
৫. কম্পনের পর করণীয় (Aftershocks)
আফটারশকস: বড় ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট আফটারশক হতে পারে। যতক্ষণ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ নিরাপদ ঘোষণা না করে, ততক্ষণ ভবনের বাইরে নিরাপদ খোলা স্থানে থাকুন।
- ক্ষতি পরীক্ষা: ঘর বা ভবন পরীক্ষা করুন। গ্যাসের গন্ধ পেলে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করুন। দেয়ালে বা ছাদে বড় ফাটল থাকলে ভবনে প্রবেশ করা থেকে বিরত থাকুন।
- সংবাদ অনুসরণ: রেডিও বা টেলিভিশনের মাধ্যমে সরকারি জরুরি নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
- সহায়তা: আহত বা আটকে পড়া মানুষদের সাহায্য করুন।
ভূমিকম্পের শিক্ষা হোক—সময় নষ্ট নয়, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। নামাজ, তাওবা এবং ভালো কাজকে কালকের জন্য ফেলে রাখবেন না। এই মুহূর্ত থেকেই আল্লাহর পথে দৃঢ়ভাবে চলুন। কারণ, জীবন অনিশ্চিত; কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টিই আমাদের একমাত্র নিশ্চিত আশ্রয়।
