থাইরয়েড সমস্যায় ওজন কমানোর কৌশল: হাইপোথাইরয়েডিজম ও ডায়েট গাইডলাইন
শরীরের বিপাকক্রিয়া (Metabolism) নিয়ন্ত্রণে থাইরয়েড গ্রন্থি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যখন এই গ্রন্থি থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে থাইরয়েড হরমোন (T3 ও T4) উৎপন্ন হয় না, তখন সেই অবস্থাকে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়। এই অবস্থায় শরীরের বিপাক হার মারাত্মকভাবে কমে যায়, যার ফলে অল্প খেলেও ওজন বেড়ে যায় এবং ওজন কমানো অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকেই ভাবেন, যেহেতু হরমোনের সমস্যা, তাই ওজন কমানো অসম্ভব।
তবে সুসংবাদ হলো—সঠিক চিকিৎসা, বিশেষ ডায়েট এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনে থাইরয়েড সমস্যায় ওজন কমানো সম্ভব। এই পোস্টে আমরা হাইপোথাইরয়েডিজমে ওজন বৃদ্ধির মূল কারণ, এবং এই অবস্থায় ওজন কমানোর জন্য বিজ্ঞান-সম্মত কার্যকরী কৌশলগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।
১. থাইরয়েড কেন ওজন বাড়ায় এবং কমানো কঠিন হয়?
থাইরয়েড গ্রন্থির হরমোনগুলো শরীরের এনার্জি ব্যবহার, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং হজম প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে।
কম বিপাক (Slow Metabolism): থাইরয়েড হরমোন কম থাকলে শরীরের ক্যালোরি পোড়ানোর গতি কমে যায়। ফলে আপনার শরীর স্বাভাবিকের চেয়ে কম ক্যালোরি ব্যবহার করে এবং বাকিটা ফ্যাট হিসেবে জমা হয়।
জল ধরে রাখা (Water Retention): থাইরয়েডের কারণে অনেক সময় শরীর জল ধরে রাখে, ফলে ওজন স্কেলে বেশি দেখায়। এটি প্রকৃত ফ্যাট না হলেও শরীরে ফোলাভাব তৈরি করে।ক্লান্তি: হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রধান লক্ষণ হলো তীব্র ক্লান্তি। এই ক্লান্তি ব্যায়াম করতে বা সক্রিয় থাকতে বাধা দেয়, ফলে ক্যালোরি পোড়ানো আরও কমে যায়।
এই সমস্যাগুলো মোকাবিলা করার জন্যই প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা এবং সুচিন্তিত ডায়েট প্ল্যান।
২. ডায়েট কৌশল: থাইরয়েড-বান্ধব খাদ্য নির্বাচন
ওজন কমাতে হলে থাইরয়েডের ঔষধের কার্যকারিতা বাড়ানোর পাশাপাশি বিশেষ খাদ্য নির্বাচন জরুরি।
ক. গ্লুটেন ও ডেইরি নিয়ন্ত্রণ:
স্বয়ংক্রিয় ইমিউন প্রতিক্রিয়া: যাদের হ্যাশিমোটোস থাইরয়েডিজম (হাইপোথাইরয়েডিজমের প্রধান কারণ) আছে, তাদের ক্ষেত্রে গ্লুটেন (গম, বার্লি) এবং ডেইরি পণ্য (গরুর দুধ) অনেক সময় থাইরয়েড গ্রন্থির বিরুদ্ধে স্বয়ংক্রিয় ইমিউন প্রতিক্রিয়া বাড়িয়ে দিতে পারে।করণীয়: ডায়েটে গ্লুটেন এবং ডেইরি পণ্য কয়েক সপ্তাহের জন্য বাদ দিয়ে দেখুন আপনার হজম ও ফোলাভাব কমে কিনা। দুধের পরিবর্তে আমন্ড দুধ বা সয়া দুধ ব্যবহার করতে পারেন।
খ. ফাইবার এবং প্রোটিন:
গুরুত্ব: ফাইবার হজমের গতি কমিয়ে পেট ভরা রাখে, এবং প্রোটিন পেশী রক্ষা করে এবং বিপাকক্রিয়া সচল রাখে। থাইরয়েডের কারণে যেহেতু বিপাক এমনিতেই ধীর, তাই প্রোটিন অত্যন্ত জরুরি।খাবার: ডিম, মুরগির মাংস, মাছ, ডাল এবং শিম। ফল, সবজি ও বীজ।
গ. বিশেষ পুষ্টি উপাদান:
আয়োডিন: থাইরয়েড হরমোন তৈরির জন্য আয়োডিন অপরিহার্য। আয়োডিনের ঘাটতি থাকলে হাইপোথাইরয়েডিজম হতে পারে।
খাবার: আয়োডিনযুক্ত লবণ, সামুদ্রিক মাছ, ডিম।
সেলেনিয়াম ও জিঙ্ক: এই দুটি মিনারেল থাইরয়েড হরমোনকে সক্রিয় (T4 থেকে T3 তে রূপান্তর) করতে সাহায্য করে।
খাবার: ব্রাজিল নাট, মুরগির মাংস, মিষ্টি আলু, বাদাম।
ঘ. গোইট্রোজেনিক (Goitrogenic) সবজি নিয়ন্ত্রণ:
কিছু সবজি, যেমন ব্রকলি, বাঁধাকপি, ফুলকপি, কাঁচা অবস্থায় বেশি খেলে থাইরয়েড হরমোনের কাজে বাধা দিতে পারে।করণীয়: এই সবজিগুলো কাঁচা না খেয়ে ভালো করে সেদ্ধ করে খান। সেদ্ধ করলে গোইট্রোজেনিক প্রভাব কমে যায়।
আরও পড়ুনঃ পেটের মেদ কমানোর সহজ উপায়
৩. ব্যায়াম এবং সক্রিয়তা: ঘুমন্ত বিপাককে জাগিয়ে তোলা
হাইপোথাইরয়েডিজম ক্লান্তি বাড়ালেও ওজন কমানোর জন্য সক্রিয়তা অপরিহার্য।
ক. শক্তি প্রশিক্ষণ (Strength Training):
বিপাক বৃদ্ধি: পেশী (Muscle) ফ্যাট বা চর্বির চেয়ে বেশি ক্যালোরি পোড়ায়। শক্তি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পেশী তৈরি করলে আপনার বিশ্রামকালীন বিপাক হার (Resting Metabolic Rate) বৃদ্ধি পাবে। এটি থাইরয়েড সমস্যায় ওজন কমানোর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যায়াম।ব্যায়াম: সপ্তাহে ২-৩ বার ওয়েট লিফটিং বা বডি ওয়েট এক্সারসাইজ করুন।
খ. কার্ডিও:
কম-তীব্রতার কার্ডিও (যেমন: দ্রুত হাঁটা, সাঁতার) ক্লান্তি না বাড়িয়ে ক্যালোরি পোড়াতে সাহায্য করে।প্রতিদিন অন্তত ৩০-৪৫ মিনিট হাঁটা নিশ্চিত করুন।
গ. ক্লান্তি মোকাবিলা:
তীব্র ক্লান্তি অনুভব করলে ব্যায়াম এড়িয়ে যাবেন না, বরং কম তীব্রতার ব্যায়াম বা যোগা করুন। ছোট ছোট ভাগে (দিনে ৩ বার ১৫ মিনিট) ব্যায়াম করুন।
৪. চিকিৎসা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তন
ওজন কমানোর আগে থাইরয়েডের সঠিক চিকিৎসা এবং হরমোন নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত জরুরি।
ক. সঠিক ঔষধ গ্রহণ:
- ওজন কমানোর সমস্ত চেষ্টা তখনই ব্যর্থ হবে, যখন থাইরয়েড হরমোনের মাত্রা (TSH, T3, T4) স্বাভাবিক থাকবে না।
- চিকিৎসকের পরামর্শে নিয়মিত ঔষধ সেবন করুন এবং প্রেসক্রিপশন পরিবর্তন বা বন্ধ করবেন না।
- দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ (Stress) অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি থেকে কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ বাড়ায়। এই হরমোন পেটের মেদ জমতে সাহায্য করে।
- সমাধান: মেডিটেশন, পর্যাপ্ত ঘুম (৮ ঘণ্টার কাছাকাছি) এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে সময় কাটানোর মাধ্যমে স্ট্রেস কমান।
গ. ঘুমের গুণমান:
- থাইরয়েডের কারণে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। কিন্তু কম ঘুম ক্ষুধার হরমোন (Ghrelin) বাড়িয়ে দেয়। পর্যাপ্ত এবং গভীর ঘুম ওজন কমানোর প্রক্রিয়াকে সমর্থন করে।
৫. কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
থাইরয়েড সমস্যায় ওজন কমানোর পথে যেকোনো ডায়েট বা ব্যায়ামের পরিবর্তন করার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
- ওজন বাড়া বা কমা হঠাৎ পরিবর্তন হলে।
- যদি ক্লান্তি, অবসাদ বা ডিপ্রেশন অনুভব করেন।
- ডায়েট শুরু করার পর যদি থাইরয়েডের ঔষধের ডোজ পরিবর্তন করতে হয়।
